ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১তম জন্মতিথি শুভ জন্মাষ্টমী
প্রভাস চক্রবর্ত্তীঃ আজ মহান ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমীকে ঘিরে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে নানা আয়োজন। সকাল থেকেই বিভিন্ন মন্দিরে গীতা পাঠ, ধর্মীয় আলোচনা, ভক্তিমূলক নামকীর্তন ও পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যানার ও ফেস্টুনে সজ্জিত মনোমুগ্ধকর পদযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডী লোকনাথ মন্দির পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকেও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রবাসী সন্তোষ কুমার দে, বিশ্বজিৎ চৌধুরী বাবুন, জুয়েল চৌধুরী, প্রিয়তম দত্ত (টাংকু), নিশান শুভ, সাবেক বিএনপি উপজেলা আহ্বায়ক হাজী ইছাক চৌধুরী, মন্দির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শ্যামল চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অনিল কান্তি দে, সুহৃদ ক্লাবের সদস্যবৃন্দ, উৎসব কমিটির নেতৃবৃন্দ, জগদানন্দ মিশন পরিচালনা পর্ষদ ও উৎসব কমিটির নেতৃবৃন্দ, শিক্ষিকা ডেইজি ভট্টাচার্য্য, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব সরোজ চৌধুরী, দীপেন বৈদ্য, ডা. সুবল দাশ, বাবলু ঘোষ ও চিন্ময় চৌধুরী বাবলুসহ অনেকে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পরম করুণাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাতা দেবকী ও পিতা বসুদেবের পুত্ররূপে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে কংসের কারাগারে আবির্ভূত হন। জন্মের পর বসুদেব শিশু কৃষ্ণকে নিয়ে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্য দিয়ে উত্তাল যমুনা নদী পার হন। অনন্তনাগের ফনার ছত্রছায়ায় এবং ঈশ্বরের কৃপায় সেই কঠিন পথ অতিক্রম করে তিনি কৃষ্ণকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকাহিনির মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। দেবকীকে ‘দৈবশক্তি’ এবং বসুদেবকে ‘জীবাত্মা’র প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ভাদ্র মাস, কৃষ্ণপক্ষ ও অষ্টমী তিথির সঙ্গে মানুষের অন্তর্জগত, মন ও সাধনারও একটি প্রতীকী সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায়।
মানবজীবনের অষ্টতত্ত্ব—মাটি, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার—এর ঊর্ধ্বে শ্রীকৃষ্ণকে ত্রিগুণাতীত পরম সত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে তাঁর আবির্ভাবের মধ্যেও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য খুঁজে পান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
ভগবানের জন্ম কংসের কারাগারে—এটিও প্রতীকী অর্থ বহন করে। কামনা-বাসনা ও মোহে আবদ্ধ মানবদেহকে কারাগারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর সেই বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখান শ্রীকৃষ্ণ। যমুনা পার হওয়ার ঘটনাকেও মানবজীবনের দুঃখ-কষ্ট, মায়া ও বন্ধন অতিক্রম করে আত্মোপলব্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চিরকালীন বিশ্বাস—‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং’। তিনি সর্বকারণের কারণ, সত্য ও আনন্দের প্রতীক। অন্যায়, অসত্য, পাপ, অহংকার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনকে দেওয়া তাঁর উপদেশই পরবর্তীতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হিসেবে মানবজাতির জন্য অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। গীতার মাধ্যমে তিনি কর্ম, জ্ঞান, ধ্যান, ভক্তি, আত্মসংযম, ন্যায়, সত্য, কর্তব্য ও মোক্ষের পথ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও বাণী যুগে যুগে মানুষকে সত্য, ন্যায় ও ধর্মের পথে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর শিক্ষা মানুষের অন্তর থেকে অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
পবিত্র জন্মাষ্টমীর এই শুভক্ষণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের চিন্ময় সম্পর্ক আরও গভীর হোক, মানুষের হৃদয় থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অশুভ চিন্তা দূর হোক এবং সমাজে সত্য, ন্যায়, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই হোক আজকের পুণ্য তিথির একমাত্র প্রার্থনা।
শুভ জন্মাষ্টমী। হরে কৃষ্ণ।
